Home » রক্তস্বল্পতার লক্ষণ, কারণ ও দূর করার উপায় – রোগব্যাধি
anemia, রক্তস্বল্পতার লক্ষণ, রক্তস্বল্পতার কারণ, রক্তস্বল্পতা দূর করার উপায়, রক্তস্বল্পতা কি, রক্তস্বল্পতা,

রক্তস্বল্পতার লক্ষণ, কারণ ও দূর করার উপায় – রোগব্যাধি

by Dr. ABM Khan
0 comment 213 views

আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা রক্তস্বল্পতা বা এনেমিয়ায় ভূগে থাকেন। এটি একটি খুব জটিল রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বিশ্বে প্রায় দুই বিলিয়ন লোকের রক্তস্বল্পতা রয়েছে। আজকের লেখায় রক্তস্বল্পতার লক্ষণ, রক্তস্বল্পতার কারণ ও রক্তস্বল্পতা দূর করার উপায় সম্পর্কে আলোচনা করবো।

রক্তস্বল্পতা কি?

আমাদের শরীরে স্বাস্থ্যকর লোহিত রক্তকণিকার অভাবজনিত কারণে শরীরের কলায় অক্সিজেন কমে যাওয়ার দরুণ যে রোগ সৃষ্টি হয়, তাই হলো রক্তস্বল্পতা। এই রোগ হলে রক্তের মধ্যে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পরিবহনর ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং নানা উপসর্গ সৃষ্টি হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

মানবদেহের শরীরের রক্তে লোহিত রক্ত কণিকা বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে গেলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। হিমোগ্লোবিন হল রক্তের একটি বিশেষ রঞ্জক পদার্থ যার কাজ হল শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করা। যেহেতু হিমোগ্লোবিন রক্তের লোহিক কণিকায় থাকে, তাই বলা যায়, লোহিত রক্তকণিকার অভাবে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।

সাধারণত পুুরুষদের চেয়ে নারীদের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম। এই সংখ্যাটি নিম্নরূপ-

  • পুরুষের রক্তের হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ১৩.৫ – ১৭.৫ গ্রাম। এবং
  • নারীদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা ১২ – ১৫.৫ গ্রাম/ডেসিলিটার।

উল্লেখিত স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম হলে রক্তস্বল্পতা ধরা হয়।

আমাদের দেশে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি রক্তস্বল্পতায় ভুগে থাকে। এছাড়া অপুষ্টির কারণে শিশুদের মধ্যেও যথেষ্ট পরিমাণে এনেমিয়া হয়ে থাকে। সাধারণত বাচ্চা থেকে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত হিমোগ্লোবিন মাত্রা ১১ গ্রাম প্রতি ডেসিলিটারের নিচে থাকলে রক্তস্বল্পতা ধরা হয়।

আরও পড়ুন:   শিশুর নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকারের উপায়

রক্তস্বল্পতার কারণ

বিভিন্ন কারণে রক্তস্বল্পতা হতে পারে। মূলত শরীরে আয়রনের উপস্থিতি কমে গেলে রক্তস্বল্পতা বা এনেমিয়া হতে পারে। কারণ আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। সাধারণত নিম্নোক্ত কারণে রক্তস্বল্পতা হতে পারে।

  • লোহার অভাব – এটি রক্তস্বল্পতার সাধারণ কারণ। রক্তের মধ্যে লোহা বা আয়রনের ঘাটতির কারণে এটি হয়ে থাকে। শরীরের লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে আয়রনের ভূমিকা খুব বেশি হওয়ায় এর অভাব রক্তের মধ্যে লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ফলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।
  • ভিটামিনের অভাব – ভিটামিনের অভাবেও শরীরে রক্তস্বল্পতা হতে পারে। বিশেষ করে ফোলেট, ভিটামিন বি-১২ ইত্যাদি। কারণ এই উপাদানগুলো শরীরে লোহিত রক্তকণিকা বৃদ্ধি করতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। তাই শরীরে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভিটামিনের অপর্যাপ্ততা হলে রক্তস্বল্পতা হতে পারে।
  • অ্যাপ্লাস্টিক রক্তস্বল্পতা – এটি রক্তস্বল্পতার খুব মারাত্মক একটি রূপ। এই রক্তস্বল্পতা হলে শরীর পর্যাপ্ত লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। সাধারণত সংক্রমণ, অটোইমিউন ডিসঅর্ডার এবং কিছু ওষুধের কারণে এই ধরনের রক্তস্বল্পতা হতে পারে।
  • সিকেল সেল রক্তস্বল্পতা – এটি মূলত বংশগত রোগ। এই ধরনের রক্তস্বল্পতায়, লোহিত রক্ত ​​কণিকার বৃদ্ধি পাবার সংখ্যা অস্থি মজ্জা থেকে লাল রক্ত ​​কণিকার গঠনের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়।

এছাড়াও কিছু বিশেষ দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেমন- থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, লিভার ফেইলিওর, কিডনি ফেইলিওর, এবং ব্লাড ক্যান্সার, রক্ত উৎপাদনকারী মজ্জার সমস্যা, রক্তের লোহিত কণিকা নিজে নিজে ভেঙে যাওয়া, অত্যধিক রক্তক্ষরণ ইত্যাদির কারণেও রক্তস্বল্পত হতে পারে।

রক্তস্বল্পতার লক্ষণ

রক্তস্বল্পতার লক্ষণ বুঝার জন্য কিছু  বিষয় খেয়াল করতে হবে। বিশেষ করে চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, শরীরে অত্যধিক দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা মাথাব্যাথা, মুখে-ঠোঁটে ঘা, চোখে ঝাপসা দেখা ইত্যাদি রক্তস্বল্পতা হওয়ার লক্ষণ। এছাড়াও নিম্নোক্ত কারণগুলো দেখা দিতে পারে-

  • লোহিত রক্তকণিকা ভাঙনের দরুণ রক্তশূন্যতায় জন্ডিস হওয়া।
  • ফলিক এসিড ও ভিটামিন বি-১২ ঘাটতিজনিত স্নায়ুবিক দুর্বলতা।
  • নারীদের মাসিক অনিয়মিত হওয়া।
  • হৃৎপিণ্ডের গতি তথা হার্টবিট বেড়ে যাওয়া।
  • খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া ও ব্যাথা অনুভব করা। কারণ দীর্ঘস্থায়ী রক্তস্বল্পতায় খাদ্যনালির ওপরের দিক চেপে যায়।
  • চুল পড়া ও চুলের উজ্জ্বলতা হারিয়ে যাওয়া। এবং চুল ও নক ফেটে যাওয়া ইত্যাদি।

এছাড়া সিকেল সেল রক্তস্বল্পতায় অস্থিসন্ধিতে, পেটে ও পায়ে ব্যাথা এবং বাচ্চাদের বৃদ্ধি বিলম্বিত হয়।

রক্তস্বল্পতা দূর করার উপায়

রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হলে এর তীব্রতা ও ধরন সম্পর্কে জেনে অবশ্যই একজন ভালো ডাক্তারের থেকে চিকিৎসা নিতে হবে। কোন উপাদানের অভাবে আপনার রক্তস্বল্পতা হয়েছে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হবে। এছাড়া রক্তস্বল্পতা দূর করার জন্য আগাম সতর্কতা হিসেবে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনতে পারি। এতে করে রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করা যেতে পারে। রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করতে আমরা নিয়মিতভাবে নিম্নোক্ত পুষ্টিকর খাবার খেতে পারি-

১। সবুজ শাক-সবজি: সবুজ শাক-সবজিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন বি ও সি থাকে। এগুলো রক্তের লোহিত কণিকা উৎপাদনে ভুমিকা রাখে। তাই প্রত্যেকদিনের খাবারের তালিকায় অবশ্যই সবুজ শাক-সবজি রাখতে হবে।

২। আয়রন সমৃদ্ধ খাবার: যেসব খাবার আয়রন সমৃদ্ধ সেসব খাবার বেশি করে খেতে হবে। যেমন- কচু, লিচু, সিদ্ধ আলু, মাংস, কলিজা, জাম ইত্যাদি। বিশেষ করে জামে থাকা আয়রন ও ভিটামিন সি রক্ত পরিশোধনে সহায়তা করে ও রক্তে হিমোগ্লোবিন বাড়ায়।

৩। মধু: মধু একটি ভেষজগুণ সম্পন্ন উপাদান। এতে ভালো পরিমাণের আয়রন আছে। আয়রন ছাড়াও কপার ও ম্যাঙ্গানিজেরও ভালা উৎস মধু। এই উপাদানগুলো শরীরে হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে সহায়তা করে। তাই প্রতিদিনি ১ চামচ মধুর সাথে লেবুর রস মিশিয়ে পান করলে রক্তস্বল্পতায় উপকারিতা পাওয়া যায়।

৪। নিয়মিত ফল খাওয়ার অভ্যাস: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত ফল খাওয়ার অভ্যাসের চেয়ে বিকল্প আর হয় না। নিয়মিত কমলা, কলা, আঙ্গুর, গাজর ইত্যাদি ফল খেলে শরীরে রক্তের উপাদান ঠিক থাকে।

৫। আনার: আয়রন ও ভিটামিন বি সমৃদ্ধ আরেকটি ফল হলো আনার। এটি দেহে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে। এছাড়াও শরীরে দুর্বলতা, ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করতেও আনার বেশ উপাকারি। নিয়মিত আনার ফল খেলে রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করা যায়।

৬। অন্যান্য খাবার: অন্যান্য যেসব খাবারে আয়রন ও ভিটামিনের উপাদান বেশি থাকে সেগুলো খাদ্যতালিকায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন- ডিম, বাদাম, খেজুর, সামুদ্রিক মাছ, সয়াবিন, কিশমিশ ইত্যাদি।

৬.আনার: আনার আয়রন সমৃদ্ধ ও ভিটামিন বি যুক্ত ফল।এটি দেহে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে। এটি দুর্বলতা,ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করতেও সাহায্য করে। নিয়মিত আনার খেলে রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ করা যায়। 

আরও জানুন:   ঠোঁট ফাটার কারণ ও প্রতিকারের উপায়

শেষ কথা

অনেকেই আছেন যারা রক্তস্বল্পতা হলেই আয়রনের বড়ি কিনে খান। এটি সঠিক ও উপযুক্ত সমাধান নয়। কি ধরনের রক্তস্বল্পতা দেখা দিয়েছে। তাই রক্তস্বল্পতার লক্ষণ গুলো জেনে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে ও ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা করাতে হবে। এর পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে আয়রন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার বেশি পরিমাণে রাখতে হবে। কারণ অধিকাংশ রক্তস্বল্পতাগুলো হয়ে থাকে আয়রনের অভাবে। তাই একটু সচেতনতাই পারে রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করতে।

You may also like

Leave a Comment