Home » টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার
টাইফয়েড জ্বর হলে কি কি খাওয়া উচিত

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকার

by Dr. ABM Khan
0 comment 247 views

স্যালমোনেলা টাইফি নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা টাইফয়েড জ্বরের সংক্রমণে হয়ে থাকে। সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে এই জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে  এবং জ্বরসহ নানা উপসর্গের মাধ্যমে টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ প্রকাশ করে। আজকের আর্টিকেলে আলোচনা করবো টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার সম্পর্কে।

টাইফয়েড জ্বর

বাংলাদেশে টাইফয়েড জ্বর খুবই কমন একটি রোগ। এটি স্যালমোনেলা টাইফি নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে হয়ে থাকে। দূষিত খাবার ও পানরি মাধ্যমে এই জীবাণূ শরীরে প্রবেশ কর এই রোগের সংক্রমণ ঘটায়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার লোকজন টাইফয়েড জ্বরে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। স্যালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তস্রোতে ও অন্ত্রনালীতে অবস্থান করে এবং খাবার ও পানি গ্রহণের মাধ্যমে আকারে বেড়ে গিয়ে রক্তস্রোতে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে জ্বরসহ নানা ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায়। আজ টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানবো।

টাইফয়েড জ্বরের কারণ

সালমোনেলা টাইফি এবং সালমোনেলা প্যারাটাইফি এই দুই ধরনের ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে টাইফয়েড জ্বর হয়ে থাকে। এটি মূলত পানিবাহিত রোগ। সালমোনেলা টাইফির সংক্রমণে সৃষ্ট টাইফয়েড জ্বরকে ‘এন্টারিক ফিভার’ বলে। এবং সালমোনেলা প্যারাটাইফির সংক্রমণে সৃষ্ট জ্বরকে প্যারা টাইফয়েড জ্বর বলে।

টাইফয়েড জ্বরের কারণ হিসেবে প্রধানত দূষিত পানি ও খাবার গ্রহণকে দায়ী করা হয়। এছাড়াও অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন থাকা এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাছাড়া টাইফয়েড জ্বরের ব্যাকটেরিয়া এক সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। এক্ষেত্রে সদ্য টাইফয়েড জ্বর থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তি বাহক হিসেবে কাজ করতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে পিত্তথলিতে সুপ্ত অবস্থায় লুকিয়ে থাকতে পারে এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে আক্রমণ করতে পারে।

টাইফয়েড জ্বরের ঝুঁকিতে কারা বেশি?

যেকোন বয়সী লোকের টাইফয়েড জ্বর হতে পারে। তবে শিশুদের এই রোগের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। টাইফয়েডের জীবাণু শরীরে প্রবেশের সাথে সাথে এই রোগ হবে এমনটা নয়। দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকলে অনেক সময় জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেও আক্রমণে অসমর্থ হয়। তবে যাদের দেহে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম যেমন- এইচআইভি পজিটিভ ও এইডস রোগীরা সহজেই টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তি বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করলেও তার মাধ্যমে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি।

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ

টাইফয়েড রোগের জীবাণু স্যালমোনেলা টাইফি শরীরে প্রবেশের ১০ থেকে ১৪ দিন পর টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। এই রোগের প্রধান লক্ষণ হিসেবে প্রথম চার-পাঁচদিন জ্বরের তীব্রতা উঠানামা করে, কিন্তু কখনও ছেড়ে যায় না। নিম্নে টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ সমূহ দেয়া হলো-

  • ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত টানা জ্বর হওয়া।
  • জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
  • ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়া সহ কারোর কারোর কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।
  • শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া ও বমি হতে পারে।
  • গা ম্যাজ ম্যাজ করতে পারে এবং রোগীর কফ বা কাশি হতে পারে ।
  • প্রচণ্ড পেটে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
  • দ্বিতীয় সপ্তাহে রোগীর পেটে ও পিঠে গোলাপি রঙের দানা দেখা দিতে পারে।
  • কারো কারো তীব্র জ্বরের সঙ্গে কাশি হতে পারে।
  • হার্ট রেট বা হৃদস্পন্দন গতি কমে যেতে পারে।
  • ওষুধ চলা অবস্থায়ও সপ্তাহ খানেক জ্বর থাকতে পারে।

টাইফয়েড জ্বর সনাক্ত করার উপায়

টাইফয়েড জ্বর সনাক্ত করার জন্য ব্লাড কালচার নামক রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর চিকিৎসকগণ বলতে পারবেন টাইফয়েড জ্বর পজিটিভ না নেগেটিভ। যদি টাইফয়েড হয়েও থাকে তবে সেটা কি প্রকার টাইফয়েড তা নির্ণয় করতে হবে। সেটা এন্টারিক ফিভার অথবা প্যারা টাইফয়েড এই দুই টাইপের হতে পারে। জ্বর হওয়ার ২য় সপ্তাহে ‘উইডাল টেস্ট’ নামক ননস্পেসিফিক ব্লাড টেস্ট এর মাধ্যমে টাইফয়েড জ্বর নির্ধারণ করা হয়।

টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা পদ্ধতি

ডাক্তারগণ এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা করে থাকেন। সঠিক এন্টিবায়োটিক প্রয়োগের পরও জ্বর কমতে চার-পাঁচদিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। যদি এই রোগের দ্রুত চিকিৎসা করা না হয় তবে জ্বর সপ্তাহ বা মাসব্যাপী থাকতে পারে। সাথে রোগীর অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। 

টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসায় রোগীকে ওষুধ প্রয়োগের পাশাপাশি তরল খাবার দেওয়া যেতে পারে যাতে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর কিংবা ডায়রিয়ার কারণে রোগীর শরীরে পানি স্বল্পতা দেখা না দেয়। এছাড়া রোগীকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। জ্বর খুব বেশি হলে ভেজা গামছা বা তোয়ালে দিয়ে রোগীর শরীর মুছে দিতে হবে। রোগীকে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে। স্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে যতদিন প্রয়োজন ততদিন পর্যন্ত।

আরও পড়ুন:

রক্তস্বল্পতার লক্ষণ, কারণ ও দূর করার উপায়

শিশুর নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকারের উপায়

টাইফয়েড জ্বরের প্রতিকার ও প্রতিরোধ

টাইফয়েড জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ ও নির্ধারিত ভ্যাক্সিন (টিকা) গ্রহণ করতে হবে। সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবন-যাপন করতে হবে। আর যেকোনো ধরনের রোগের থেকে মুক্ত থাকতে হলে সচেতনতার বিকল্প নেই। কারণ অসচেতনতা থেকেই অধিকাংশ রোগের আক্রমণ হয়ে থাকে। তাই টাইফয়েড জ্বর প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের কিছু উপায় আপনাদের জানা থাকতে হবে। নিচে সেই উপায়গুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

  • শাকসবজি, ফলমূল এবং রান্নার বাসনপত্র সবসময় পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে।
  • খাবার ভালভাবে রান্না বা সিদ্ধ করে খেতে হবে।
  • খাবার গ্রহণ, প্রস্তত বা পরিবেশনের পূর্বে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে।
  • পানি দূষিত হলে ফুটিয়ে খেতে হবে অথবা ভালো ফিল্টার ব্যবহার করে খেতে হবে।
  • যত্রতত্র ফুটপাতের দোকানের খাবার গ্রহণ এবং পানি পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন টয়লেট ব্যবহার করতে হবে।
  • টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে।

টাইফয়েড জ্বর থেকে বাঁচার একমাত্র মূলমন্ত্র হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। মনে রাখবেন, দূষিত পানি ও দূষিত খাবারই টাইয়েড রোগের প্রধান কারণ। এছাড়া সংক্রমিত ব্যক্তিও এর বাহক হতে পারে। তাই টাইফয়েড আক্রান্ত ব্যক্তি ও সংক্রমণ এলাকা এড়িয়ে চলতে হবে। আর টাইফয়েড জ্বর দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা নিতে হবে।

আশাকরি, টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও প্রতিকারের উপায়গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞাত হয়েছেন। এরকম স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন টিপস পেতে রোগব্যাধি ওয়েবসাইটের সাথে থাকুন।

You may also like

Leave a Comment